দার্জিলিং ভ্রমন

স্বপ্ন যে সত্যি হয় তার প্রমাণ আমার দার্জিলিং ট্রিপ। ১২ ই মে আমরা দার্জিলিং যাওয়ার জন্য রওনা হচ্ছি। তিন বছর ধরে যে স্বপ্ন দেখে গেছি তা আজ বাস্তব হতে যাচ্ছে। তিন বছর আগে প্রথম আমি কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রেমে পড়লাম, তখন ই ঠিক করে ফেলেছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা আমায় দেখতেই হবে। এরপর দিন যায় মাস যায় কিন্তু কোন লক্ষণ ই দেখছি না দার্জিলিং যাওয়ার, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার এমন সময় হঠাৎ প্রিয়ার ফোন , “প্রার্থনা, দার্জিলিং যাচ্ছি যাবা তুমি?” আমি পাত্তাই দিলাম না কারন এর আগে অসংখ্যবার প্রিয়া কোথাও যাওয়ার প্রোগ্রাম করে তা কান্সেল করেছে আর দার্জিলিং এর মত সেন্সিতিভ জায়গা নিয়ে আমি কোন রুপ আশা ভঙ্গ করতে চাই না ওকে বলে দিলাম “ টিকেট কাটার ১ সপ্তাহ আগে আমাকে জানিও” যেই কথা সেই কাজ ভিসা টা করে রাখলাম এরপর আর তেমন যোগাযোগ নেই হঠা ৎ দেখি একদিন প্রিয়া ফোনে জিজ্ঞেস করছে “টিকেট তো করছি” আমি তখন ও বিশ্বাস করতে পারছি না ভাবলেশহীন ভাবে বললাম “কর” এদিকে আমার নতুন অফিস ৬ মাসের আগে ছুটি নেয়া রীতিমত নিয়ম বহির্ভূত কাজ কিন্তু দার্জিলিং বলে কথা! প্রয়োজনে চাকরি যাবে তাও ত্রিপ বাতিল করা যাবে না সত্যি সত্যি টিকেট করা হয়ে গেল! আমি তো বিশ্বাস ই করতে পারছিলাম না দার্জিলিং যাওয়ার টিকেট আমার হাতে! অফিস থেকে ৫ দিনের ছুটির জন্য এপ্লাই করে ফেললাম ছুটি পেয়েও গেলাম কে কি ভাবল জানি না আমি এসব চিন্তা  বাদ দিয়ে এখন কাঞ্চনজঙ্ঘার চিন্তায় মগ্ন লাগেজ গোছানোর সময় বার বার মনে হচ্ছিল স্বপ্ন এভাবে সত্যি হয়!

বর্ডারের সব কাজ সারছি। আমার হাতে এখন আমার রুপি। চাকরির টাকার রুপি হাতে নিয়ে বেশ ভালই লাগছ… দুপুরের  খাবার খেয়ে শিলিগুড়ি থেকে জিপ ভাড়া করা হল। গন্তব্য দার্জিলিং। কার্শিয়ং দিয়ে দার্জিলিং যখন যাচ্ছিলাম আশেপাশের সৌন্দর্য দেখে বিস্মিত হয়ে যাচ্ছিলাম! একে তো তীব্র ঠাণ্ডা তার উপর আবার পাহাড়ি উঁচু পথে জিপ এগোচ্ছে। কানে তালা লেগে যাচ্ছে। পাহাড়গুলো ঘন কুয়াশায় ঢেকে ছির। দূর থেকে কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে ছিল দেখতে দারুণ লাগছিল! দার্জিলিং পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ৬ টা মত বেজে গেল। দুইজন চলে গেল হোটেলের খোঁজে। বাকিরা আমরা এই ফাঁকে  গরম চা খেয়ে নিলাম। পুরো দার্জিলিং শহরটা এখন চোখের সামনে। পুরো শহরটাই পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সাজানো। হোটেল ঠিক হল। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি হোটেলের দিকে। কোন জনমানব ্নেই। এই সন্ধ্যাতেও মনে হচ্ছিল গভীর রাত হয়ে গেছে। রুমে উঠলাম প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ততক্ষণে আমাদের জমে যাওয়ার দ… কলের জল বরফ কুঁচির মত ঠাণ্ডা। আমি অবশ্য বিশাল সাহস করে গোসল করতে গেলাম। কিন্তু মাথায় পানি ঢালতে পারলাম না। তাতেই শীতে কাঁপতে কাঁপতে লেপের নিচে ঢুকলাম। কাপাকাপি যেন থামতেই চায় না! ঘুমিয়ে পরলাম।

সকালে উঠে জানালা খুললাম। যেই দৃশ্য দেখলাম তা আমি কোনদিনও ভুলতে পারব না। কুয়াশার চাদর পরা পুরো শহরটা এখন দিনের আলোতে আমার সামনে। সামনেই এক ছাদে পায়রার ঝাক। একজন বৃদ্ধ পায়রাগুলোকে খাবার দিচ্ছে। জানালার ধারে বসে কিছু সময় পার করে দিলাম। এরপর বের হলাম সবাই সকালের খাবারের জন্য। হোটেল চেঞ্জ করা হবে তাই খাবারের পর আরও কিছু হোটেলের খোঁজ চলল। পেয়েও গেলাম। এর রুম গুলো পুরো কাঠের। আমরা একটু ফ্রেশ হয়েই বেড়িয়ে পড়লাম। গন্তব্য রক গার্ডেন। জিপ ঠিক করার সময় পরিচয় হল নিধিদের সাথে ওরাও আমাদের হোটেলেই উঠেছে নিধির বয়স ৩ বছর এত বুদ্ধিদীপ্ত বাচ্চা আমি খুব কম ই পেয়েছি ওদের সাথে এক সাথেই আমরা ঘুরলাম সব জায়গায় রক গার্ডেনে যাওয়ার পথটা ভীষণ আঁকা বাঁকা গাড়ি যে কিভাবে চলছিল তা একমাত্র ড্রাইভার ই বলতে পারবে  প্যাঁচ খেতে খেতে আমরা অবশেষে পৌঁছলাম পৌঁছানোর পর ও শুধু উপরে উঠতে থাকো পাহাড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আঁকা বাঁকা পথ শুধু উপরে উঠার পথ। যতই উপরে উঠা যায় ততই মনমুগ্ধকর একেকটা দৃশ্য সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয় ফিরে এসে রাতের নেপালি থালি খেলাম রাতের খাবারে হোটেলের সাথেই সব খাবারের দোকান আর বার তো প্রত্যেক হোটেলের সাথেই লাগোয়া রাতের খাবার সেরে আমরা হোটেলে ফিরছি ছেলেরা অম্নি গেল বোতল কিনতে দার্জিলিং এসে এই জিনিসের স্বাদ না নিলে কি হয়!

পরদিন গেলাম পিস প্যাগোডা, জু আর হিমালয়া ইন্সটিটিউট। নেপালি পোশাক পরে একেবারে খাশ চা বাগানের কর্মী হয়ে গেলাম। পিস প্যাগোডার চূড়ায় বিশাল বুদ্ধ মূর্তি। দারুণ লাগল। অপার্থিব এক শান্তি মিশে আছে জায়গাটায়। পাহাড়ের উপরে দেখেই হবে, ওখানে বসে প্রার্থনা করতে গেলে এমনিতেই চোখ বেয়ে জল নেমে আসে। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের বুকে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি কেমন এক ঘোর লাগায়। সব গুলো জায়গাতেই নিধির আনন্দ আর দেখে কে! পথ যত দুর্গম ই হোক, যত উঁচুতেই উঠা লাগুক না কেন, মা বাবার সাথে দিব্যি নিধি চলে আসছে। নিধির প্রতি চমৎকার এক মায়া পড়ে যায় পুরো ট্রিপ টায়।

সন্ধ্যায় ফিরে এসে আমরা গেলাম মল এ ঘুরতে। স্ট্রিট মার্কেট বরাবর ই আমাকে খুব টানে। দার্জিলিং বিখ্যাত মোমো খেলাম। চমৎকার!

টাইগার হিল। এবার পালা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার। ভোর হবার অনেক আগেই আমরা রওনা হলাম। যখন পৌঁছলাম তখন ইতিমধ্যেই ওখানে অনেক মানুষের সমাগম পিক পয়েন্টের দিকে এগচ্ছি আর আমার ভিতরের তীব্র উত্তেজনাটা টের পাচ্ছি আসলেই কি দেখতে পাব? দেখতে কেমন হবে? ছবির মত নাকি আরও বিশাল, আরও সুন্দর? পিক পয়েন্টে পৌঁছলাম মানুষজনদের পিছনে ফেলে আমি এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আমাকে আর কেউ আটকাতে পারবে না আমি এগচ্ছি আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা কে দেখতে সবাইকে পিছনে ফেলে পাহাড়ের চূড়ায় একটা গাছের গোঁড়ায় কোন রকমে বসে পড়লাম উত্তেজনাটা ততক্ষণে এমন ই পেয়ে বসেছে যে দাঁড়ানোর শক্তি আর ছিল না এবং বসে পড়তেই আমার অশ্রু বিন্দু গুলও আর বাঁধা মানতে পারল না সব বাঁধা ছিন্ন করে তারা আমার গাল বেয়ে নিচে ঝরতে লাগল আমি কিছুতেই থামাতে পারলাম না আমার চোখের সামনে এখন কাঞ্চনজঙ্ঘা মাথা উঁচু করে টান টান হয়ে দাড়িয়ে আছে। তার গাম্ভীর্য, তার তীব্র আত্মবিশ্বাস আর সৌন্দর্যের বাহুল্য নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে আছে আর আমাকে বলছে “তুমি এসেছ! তুমি অবশেষে এসেছ!” আমি কতক্ষণ অঝরে কাঁদলাম। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় কিন্তু তবু প্রভু দিয়ে দেন। তার দয়া, তার করুণা বোঝার সাধ্যি আমাদের থাকে না। আমারও ছিল না। তাই এই দুর্লভ যখন লভ্য তখন আমার কি করা উচিত বুঝতে পারি না। প্রাণ ভরে, চোখ ভরে দেখছিলাম। স্বপ্নের বাস্তবতা দেখছিলাম। এমন অনুভুতি পেয়ে আজ আমি ধন্য। অন্য অনেকের চেয়ে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। প্রভুকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমন মুহূর্ত কৃতজ্ঞতার মুহূর্ত, প্রাপ্তির মুহূর্ত, জয়ের মুহূর্ত। এদিকে আমি হ থঠাৎ বসে পরায় অন্যরা ভাবছিল আমার শরীর খারাপ লাগছে কিনা প্রিয়া আমার ব্যাপারটা বুঝল। সবাই কে বলল না, আমি ঠিক আছি। সবাই ফটো তুলতে ব্যাস্ত কিন্তু আমার এসব কোন কিছুর প্রতিই তখন মন নেই। যখন যাওয়ার সময় হল তখন একটা ছবি তুললাম আমার কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে। সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকল। আমার ঘোর তখন ও কাটছে না। ফিরে যেতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। মনে মনে কথা দিয়ে আসলাম, “আমি আবার আসবো।  আসতে আমাকে হবেই ।“

পরদিন আমরা এমনি বের হলাম আশে পাশে ঘুরে দেখলাম, দার্জিলিং টি খেলাম। সিনেমা হলে সিনেমাও দেখতে ঢুকলাম। অবশ্য সিনেমা দেখা হল না কিছুই সবাই আরামে একটা ঘুম দিয়ে উঠলাম এই সুযোগে! রাতে আবার গেলাম মলে। ফিরে এসে ঘুম।

পরদিন ফেরত যাত্রা। গন্তব্য শিলিগুড়ি। শিলিগুড়িতে এক রাত থাকলাম। পরদিন ঢাকার জন্য যাত্রা আরম্ভ হল। নিধিদের খুব মিস করছিলাম। ওরা দার্জিলিং এই থেকে গেল আরও একদিন থেকে ব্যাক করবে। দিনগুলো ভুলার নয়। আবার যাব, এখন তার ই দিন গুনা।

 

 

Share This:
Close Menu

Content

Share This: