পরিবর্তন

আমার নাম রিফাতুল ইসলাম মিশাদ। খুব ছোট বেলায় লেখাপড়ায় অমনোযোগীতা ও দস্যিপনার জন্য বাবা মার সিদ্ধান্তক্রমে বাড়ি থেকে অনেক দূরে বডিং মাদরাসায় ভর্তি করা হয়েছিলো আমাকে। সেখানে থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী দিতে পরি নি, সবসময় বাড়ির কথা মনে পরতো। স্কুল গন্ডি অষ্টম শ্রণী পর্যন্ত পার করেছিলাম। স্কুল লাইফেই ক্লাসের এক অতি সুন্দরী, রুপসী ও মেধাবী কন্যার প্রেমে পরে যাই। হাহা যে বয়সে প্রেমের প’ও বুঝতাম না সে বয়সেই প্রেমে পরে যাওয়া ভালো কিছুর লক্ষণ নয়, যা তখন আমি বুঝতামনা তারপর প্রেম প্রস্তাব দেবো কিনা ভাবতে ভাবতে একদিন সাহস করে ভালোলাগার কথা বলেই দিলাম তাকে। তারপর তানিশা (যাকে আমি পছন্দ করতাম) বললো যে কয়েকদিন ভেবে তারপর জানাবে আমাকে। আমিও ওর কথায় রাজি হয়ে যাই। প্রায় এক সপ্তাহ যাবার পর একদিন ক্লাস শেষে ও আমাকে ডেকে বলেছিলো, ওর ও আমাকে খুব ভালো লাগে। এই এক সপ্তাহ আমার কাছে এক বছর মতন মনে হলো । অবশেষে ওর কথা শুনে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি একজন মনে হচ্ছিলো। কি যে শান্তি লাগছিলো তা বলে বোঝানো সম্ভব না।

তারপর আস্তে আস্তে দিন গড়াতে লাগলো, আমি ও তানিশা, একে অপরের প্রতি ভালোলাগাটা বেড়েই চলতে থাকলো দিন দিন। মাঝে মাঝেই ওর সাথে ঘুরোঘুরি করা হতো আর আমার কাছে ওর ছোট ছোট বায়না থাকতই, যা আমার ভালো লাগতো খুব এবং আমিও সাধ্য মতন ওর সব আবদার গুলো পূরণ করতে চেষ্টা করতাম। এভাবে ছোট ছোট খুনশুটি, আবদার, হাসি আনন্দের মাঝে এক’পা, দু’পা করে আমাদের ভালোবাসার বন্ধনটা আরো জোড়ালো হচ্ছিলো।
এদিকে লেখাপরার অবস্থা খুবই বাজে হয়ে যাচ্ছিলো দিনে দিনে, কিন্তু এতে আমার কিছু যায় আসেনা, আমার মন জ্ঞান ধ্যান সবই তো ক্লাসের ওই প্রথম কাতারের সবথেকে ভালো ছাত্রীটির উপর ছিলো, একবারো ভাবিনি যে ক্লাসের শেষ কাতারের সব থেকে বাজে ছাত্র হয়েও ক্লাসের সবথেকে ভালো ছাত্রীর মনে জায়গা পাবো।

অনেকদিন পর হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ও আগের মতন আর আমার সাথে কথা বলতো না। দেখা করার চেষ্টা করলেও বিভিন্নভাবে এড়িয়ে যেতো আমাকে। আর এদিকে আমি ওর সাথে একটু কথা বলার জন্য, ওকে একটুখানি দেখার জন্য ছটফট করতে থাকতাম। তারপর ভাবলাম নাহ্ এভাবে আর থাকা যায় না, ওর থেকে আমি আর দূরে থাকতে পারছি না। আমি তানিশাকে ভালোবাসি আর ও ও আমাকে ভালবাসে, তাহলে পরিবারকে জানিয়ে দিবো সব। তানিশা কে এ কথা বলার পর ও একদমই রাজি হলো না। তানিশা খুব বিরক্ত হচ্ছে ভেবে আমি কষ্ট পেলাম।

যথারীতি আমি আমার পরিবার কে গিয়ে সব বললাম। প্রথম প্রথম পরিবারের সবাই খুব রেগে গিয়ে সম্পর্কটা কে মেনে নিতে চাইলো না উলটো আববুর হাতে মার খেলাম অনেক আমিও হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নই । শেষমেষ কিছুদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো।
কিন্তু তানিশার পরিবারকে তানিশা কিছুই বলতে পারে নি। ওকে অনেকবার জিঙ্গাসা করার পর বলতো ওর ফ্যামিলি এটা কখনই মেনে নিবে না। তারপর আমিও ভবলাম যে, ঠিকই তো, ওর পরিবার এলাকার স্বনামধন্য ও উচ্চবিত্তশালীদের মধ্যে একটি, এরকম ভাবে আমার মতন একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেকে পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক আর তা ছাড়া বয়সের ও একটা ব্যপার ছিলো । কিন্তু তারপরও আমি হাল না ছেড়ে ওর ফ্যামিলির সাথে কিভাবে যোগাযোগ করা যায় তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকলাম আর প্রত্যেকবারই আমাকে তানিশা বাঁধা দিতো। এভাবে এক সময় ওর সাথে আমার যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দেখা করা বা কথা বলার জন্য বললেও ইগ্নোর করতে থাকে। এভাবেই পার হয়ে যাচ্ছিলো সময় গুলো।

হঠাৎ একদিন এক কাছের বন্ধু আরাফের সাথে দেখা হয়ে গেলো আমার। ও আমাকে তানিশার খবর দিলো, আর জিঙ্গাসা করলো, তানিশার সাথে আমার ব্রেপআপ হয়ে গেছে কিনা?
আরাফের মুখ থেকে এ কথা শোনারপর বুকটা হঠাৎ কেমন যেনো মোচড় দিয়ে উঠলো। তারপর আরাফ কে জিঙ্গাসা করলাম হঠাৎ এ কথা কেনো বললো ও??
পরে ওর মুখ থেকে যা শুনলাম তার জন্য বিন্দু মাত্র প্রস্তুত ছিলাম না আমি। আমার পুরো পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কিছুটা সময় চুপ করে ঠায় দাড়িয়ে থেকে ওর কথা গুলো হজম করার চেষ্টা করলাম।
আরাফ বললো যে – তানিশা কে কয়েকদিন সাইফের সাথে দেখেছে ও । সাইফও আমার খুব কাছের বন্ধু।
আরাফের কথা শুনে তারপরও ভাবলাম যে, নাহ্ হয়ত এমনিতেই ওরা দুজন এক সাথে ছিলো। ব্যাপারটাকে সেরকম সিরিয়াস ভাবে না নিলেও, আমার প্রতি তানিশার দিন দিন এরকম অবহেলার কারণে মনের ভেতরে ভয় ও সন্দেহ দুটোই কাজ করছিলো। খুব যে ভালোবাসি তানিশা কে, ভয় হয় যদি আরাফের কথা সত্যি হয় আর আমি যদি আমার ভালোবাসাটা কে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলি। তাহলে সত্যিই আমি পাগল হয়ে যাবো।
আরাফের কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য শেষ পর্যন্ত তানিশা কে ফলো ও করেছিলাম। অবশেষে তানিশাই একদিন এসে সাইফ আর ওর সম্পর্কের কথা জানিয়ে ছিলো আমাকে। ওর মুখ থেকে একথা শুনে ঠিক কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সেদিন বুকে পাথর চাপা দিয়ে ওর সামনে থেকে সড়ে এসেছিলাম।

নিজেকে খুব গুটিয়ে নিতে থাকলাম, খাওয়া দাওয়া ছেড়েই দিয়ে ছিলাম প্রায়, অসুস্থ হয়ে পরেছিলাম দিন দিন। তারপরও জোড় করে আম্মু এসে খাবার খাওয়া দিতো আর আমার এরকম অবস্থা দেখে খুব কান্না ও করতো।
এভাবে কতদিন যাবার পর এক সময় কিছু বন্ধুদের পাল্লায় পরে সিগারেট খাওয়া রপ্ত করে ফেল্লাম তারপর ওদের সাথে থেকে থেকে এক সময় ড্রিংক করাও শিখি গেলাম। তাও মনের অশান্তি কিছুতেই দুর করতে পারলাম না। কি করলে এমন ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি মিলবে তার পথ খুজতে থাকলাম। বিভিন্ন কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেল্লাম।
দিন যেতে যেতে অনেক গুলো বছর কেটে গেলো। ডিপ্রেশনের মাত্রা যখন দিন দিন বেড়েই চলছিলো তখন এক পর্যায়ে নামাজ পড়া শুরু করলাম। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ছুটির দিন গুলোতে সকালে কোরআন শরীফ পরতাম।
তা ছাড়াও বিভিন্ন ইসলামিক গজল, ওয়াজ ও ইসলামিক আলোচনা শুনতে থাকলাম। অন্যরকম এক শান্তি এলো মনে। সব রকম বাজে সঙ্গ ত্যাগ করলাম। ইসলামিক পথে জীবন কে গড়তে থাকলাম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ , রোজা এসব কিছুই যথাযথ ভাবে পালন করতে চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে রাতে তাহাজ্জুদ নামাজও আদায় করতে শুরু করলাম। এভাবেই নিজেকে সব রকম খারাপ ও গুনাহ্ এর পথ থেকে বাচিঁয়ে রাখার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছি।বর্তমানে আমি আমার নিজস্ব পেশায় সফলতা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি আমার পরিবারের সকল সদস্য , বাবা,মা,ভাই বোনদের দ্বায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছি। জীবনের বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হতে হাল না ছেড়ে দিয়ে আজ এ পর্যায়ে পৌছেছি আমি রিফাতুল ইসলাম মিশাদ।

হুম, আমি ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। এখন বলতে কোনো দ্বিধা নেই, আল্লাহ্ যা করেন তা সব সময় বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন।

আসলে জীবনে সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে। চিরস্থায়ী দুঃখ কখনই থাকে না একসময় না একসময় ঠিকই সুখের দেখা মিলবে। সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়েই আমাদের জীবন। সফল ব্যক্তিরা কোনো এক সমর ব্যর্থ হয়েছিলেন বলেই, হাল ছেড়ে না দিয়ে চেষ্টা ও পরিশ্রমের দ্বারা আজ তারা সফল ব্যক্তিত্ব।

সমাপ্ত)*

Share This:

Afroza Akter

i wanna show the world that i can do something too .
Close Menu

Content

Share This: