পরোপোকার

“””পরোপোকার”””
৪ বছর আগে এক সন্ধ্যায় বড় মামা একটি পেপারে ছোট মামার ও আম্মুর স্বাক্ষর নিলো।তবে অনেক রহস্য করে স্বাক্ষর টা নেওয়া হল।কাগজে কি লেখা আছে বা কিসের জন্য স্বাক্ষর তা কাউকে পড়তেও দিলেন না বা নিজেও বললেন না।সবাই সবার দিকে হা করে চেয়ে রইল।আমি মামাকে বললাম এইটা কিসের জন্য মামা? মামা হাসিমুখে জবাব দিলো, সময় হলে সবই জানবে।ধরে নাও আমি তোমার মামা ও আম্মুকে নিঃস্ব করে দিচ্ছি। আমরা সবাই শব্দ করে হাসতে লাগলাম।কারন এটা কোন দিন সম্ভব নয়।তার সবকিছুই তো আমাদের জন্য যা অন্ধ হলেও বুঝা যাবে।মামা বলল এখন সবাই নিজ নিজ কাজে মন দাও। আর আমি আগামী কিছুদিন আমার বিশেষ কাজে বাইরে যাবো। কারো চিন্তা করার দরকার নাই। তারপর ছোট মামা ও মামিকে কাছে ডেকে মামির হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল সংসার টা তোমাদের হাতে কিছুদিনের জন্য রেখে গেলাম।বাচ্চাদের খেয়াল রেখো আর এগুলা খরচ করিও, যদি আরও লাগে তবে এই ক্রেডিট কার্ডটি রইলো।
যাবার আগে আমাকে বললেন “সব সমস্যার সমাধান আছে,শুধু টেকনিক টা বুঝে সমস্যার মুখোমুখি দাড় করাতে পারলেই হলো। ভয় পাবে না আর পরাজয় স্বীকার করবে না, যদি স্বীকার করে নাও তবে জয়ের আশা শেষ। প্রয়োজনে কৌশল পাল্টাবে”। আমি বুঝলাম না কেন আমাকে এই কথা গুলো বলল। তবে বলেছে যখন তখন এর অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে।
প্রায় একমাস মামার কোন খবর নাই।বাসার সবাই চিন্তিত। বিশেষ করে আম্মু মাঝে মাঝে কান্না শুরু করে দেই। আমাকে সবাই জিজ্ঞাসা করে তোর সাথে কি কোন কথা হয়েছে তার। আমি না বললে আবার হতাশায় ডুবে যায়।
মামা বাসায় আসলেন। শুকিয়ে গেছেন অনেকটা।এসে সবার সাথে কথা বললেন। আব্বু, আম্মুর খোজ নিলেন। আমাকে পাশে বসিয়ে কিছুক্ষন আদর করলেন। তার পর সেই রুমে ঢুকে পড়লেন সাথে নিয়ে আসা একটা বক্স নিয়ে। পুরো ১ দিন পর বের হলেন। বিকাল বেলায় মামা শুয়ে ঘুমাচ্ছে। বুঝলাম গত রাতে ঘুমায়নি।
হঠাৎ আমি লক্ষ করলাম তার পেটে সেলাইয়ের দাগ। আমার বুঝতে বাকি রইলো না এটা কিডনি অপারেশন করার সেলাইয়ের দাগ। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাহলে কি মামা কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন? না না এটা হতে পারে না। আমি রুম থেকে বের হয়ে ছোট মামা ও মামিকে বললাম। তারা দুজনে রুমে গিয়ে দেখলো। মামা ঘুমাচ্ছে দেখে জাগালো না। বাইরে এসে মামি কান্না শুরু করে দিলো। আম্মুকে ফোন দিয়ে শুধুই কাদতে থাকলো। আম্মু সন্ধ্যায় আসার কথা ছিল কিন্তু মামির কান্না ও এর কারন শুনে আম্মুও হাজির ৩০ মিনিটের মধ্যে। বুঝায় যাচ্ছে তিনি সারা রাস্তা কাদতে কাদতে এসেছেন। এসেই সরাসরি বড় মামার রুমে গেলেন। কাটা দাগ ও সেলাই দেখে আম্মু আরো জোরে চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করলো।
সেই চিৎকারে মামা ঘুম থেকে চমকে উঠলো। তারপর বলল কি হয়েছে? এভাবে কান্নাকাটি কেন? আম্মু মামাকে জড়িয়ে ধরে বলল তোমার কি হয়েছে ভাইয়া? তোমার পেটে কাটা দাগ কেন? তোমার কিডনির কি কোন সমস্যা হয়েছে? বড় মামা আম্মুর মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন পাগলী বোন আমার। তার পর রুমের চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন সবার চেহেরা। আমরা সবাই কাদছি।ছোট মামা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাদছে। ছোট মামাকে কাছে ডাকলেন।মামিকে পাশে বসতে বললেন। তারপর বললেন আমার কিছুই হয়নি। আমি সম্পুর্ন সুস্থ। আমি আমার একটা কিডনি এক অসহায় মানুষকে দিয়েছি যার কারনে একটি সন্তান এতিম হওয়া থেকে বেচে গেছে।
বড় মামার কথা শুনে আমি কান্না থামিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম। মামি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, ওমাগো! এ আপনি কি করেছেন? আল্লাহ, ও মাবুদ এই ফেরেস্তার মত মানুষটাকে তুমি ভাল রাখো।
ছোট মামা অভিমান হয়ে বলল তোমার জীবন,তোমার ইচ্ছা,আমার কি? তাই বলে কাদতে কাদতে বের হয়ে গেল। বড় মামা কিছু বলতে গিয়ে চুপ হয়ে গেল।আম্মু কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছিল। তার পর হঠাৎ আবার কাদতে কাদতে মামাকে গালি দেওয়া শুরু করলো।আমি অবাক!আম্মু বিছানার চাদর এলোমেলো করে দিলো, একটা বালিশ নিয়ে ছুড়ে মারলো দরজার দিকে।মামা একটু হাসিমুখে বলল হচ্ছেটা কি? এই বয়সে এই সব পাগলামি কেন তোমার?বাচ্চারা কি শিখবে?
আম্মু যেন আরো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। বলতে শুরু করলো, চুপ থাক তুই।তা না হলে রুম থেকে বের করে বাইরে ফেলে আসবো।বাচ্চারা যা ইচ্ছা তাই শিখুক কিন্তু তোর মত যেন এতো দানবীর মহসিন না হতে শেখে। কেন করলি এমন? এত বড় সিদ্ধান্ত একাই নিলি? আমরা কি তোর কেউ না? মা তোমার ছেলে সারাজীবন তোমাকে জ্বালিয়েছে, তোমার পর এখন আমাদের জ্বালাচ্ছে। ও আব্বা,ও মা তোমরা এসে তাকে বুঝায় যাও আর না হলে আমাদের নিয়ে যাও। তোমাদের মত যদি সেও চলে যেতো তবে আমাদের কে পরম যত্নে আগলিয়ে রাখতো। এভাবে আম্মু প্রলাপ বকতেই থাকলেন।
বড় মামা আমাকে তার বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং আবির, মায়া, রিতুকে পাশে বসতে বললেন। আজকে আমি দেখলাম বড় মামাকে সবাই কতটা ভালবাসে। এতদিন সবার ভয়টা খেয়াল করতাম।আসলে আমি ভুল ছিলাম, সবাই মামাকে যতটা ভয় করে তার চেয়ে অনেক বেশি ভালবাসে।
পরে আমি আম্মুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- তুমি যে বড় মামার উপর এইভাবে ক্ষেপেছিলে, তোমার কি সঠিক জ্ঞান ছিল? ভয় করেনি এতটুকুও? আম্মু মুচকি হাসি দিয়ে বললেন – তোর মামাকে আগে আমি কত বকা দিতাম।কতবার রাগ হয়ে গলাটিপে ধরেছি,কতবার তাকে তোর নানুর ভয় দেখিয়ে কান ধরিয়ে দাড় করিয়ে রেখেছি। কতবার জেদ করে কত কি কিনে নিয়েছি ভাইয়ার কাছে।
আমিঃ কিন্তু মামা যে তোমার বড়।
আম্মুঃ তো কি হয়েছে? আমাকে সবচেয়ে বেশি আদর করতো ভাইয়া।তোর ছোট মামা আর আমি ছিলাম ভাইয়ার দুইটা চোখ। মাঝে মাঝে ভাইয়া আমার ব্যাগ থেকে, তোর ছোট মামার পকেট থেকে টাকা নিয়ে গিয়ে খাবার কিনে আনতো। আমরা জানতাম না। সেগুলা মজা করে সবাই খাওয়ার পর টের পেতাম যে আমাদের বোকা বানিয়েছে।
আমিঃ তাহলে মামা এখন এমন কেন?কি রহস্য ঐ রুমের? মামা কি কাওকে ভালবাসতো?
আম্মুঃ জানিনা। ভালবাসার কথাও কোন দিন শুনিনি। যে দিন তোকে বুকে জড়িয়ে পাগলের মত কাদতে থাকলো সেই দিনের পর তার পরিবর্তন শুরু। কোন এক অজানা ঝড় আমাদের সেই চিরচেনা ভাইকে অচেনায় পরিনত করে ফেলেছে। তার ১ম সঙ্গী হয়ে গেল একাকিত্ব আর ২য় সঙ্গী তুই। তোর নানিকে অনেকবার বলে সেই রুমটি নিজের মনের মত করে বানিয়েছে। বানানোর সময়ও আশে পাশে আমাদের কাওকে দাড়াতে দিতো না। তার স্বপ্ন,পেশা ও ভাললাগাকে বাদ দিয়ে কেমন জানি হয়ে গেল।তোর নানু ভাই এইজন্য কত রাগ হয়েছে,গালি দিয়েছে এমনকি কয়েকবার গায়ে হাত তুলেছে।এসবের কোন কিছু ভাইয়ার গায়ে লাগে নি। এরপর থেকে যতবারই হেসেছে তা ছিল অভিনয়। আর যখন ভাইয়া মনখুলে হেসেছে তার কারন ছিলি তুই। তোর জন্যই মাঝে মধ্যে তার আসল হাসিটা আমরা দেখতে পেতাম।
লক্ষ করলাম আম্মুর চোখে পানি।আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম।বুঝতে পারলাম অনেক বড় রহস্য লুকিয়ে আছে মামার জীবনে। আম্মু বলল রাফাত তুই এমন কিছু করিস না বাবা যার কারনে ভাইয়া কষ্ট পাই। আমি চিন্তা করতে শুরু করলাম কবে মামার এই রহস্যটা আমি জানতে পারবো এবং তা কিভাবে?
বড় মামা নাই। আমার সুযোগ হয়েছে সব জানার। সেই রহস্যঘরে প্রবেশ করার।
আজ আমার হাতে বড় মামার লেখা অনেক গুলো ডায়েরি। আমি বিস্ময় নিয়ে একের পর এক ডায়েরি পড়ে যাচ্ছি। এই রহস্যঘরে আমি টানা ২ দিন ধরে আছি। সবাই অনেক চিন্তায় পড়ে গেছে। কি হচ্ছে আর ভবিষ্যতে কি হবে তা নিয়ে অবশ্যই বাইরে চলছে চুল চেরা বিশ্লেষণ। সবগুলো ডায়েরি পড়ে শেষ করলাম। এখন আমি জানি মামার সব রহস্য।
এখন বুঝলাম সেইদিন মামা কেন বলেছিলেন
“সব সমস্যার সমাধান আছে,শুধু টেকনিক টা বুঝে সমস্যার মুখোমুখি দাড় করাতে পারলেই হলো। ভয় পাবে না আর পরাজয় স্বীকার করবে না, যদি স্বীকার করে নাও তবে জয়ের আশা শেষ। প্রয়োজনে কৌশল পাল্টাবে”

Share This:

jannatul

i love story writting
Close Menu

Content

Share This: