ভেলেন্টাইন্স ডে স্পেশাল ভালোবাসার গল্প:- মিলনের কান্না

-তুই এমন একটা কালো মেয়ের জন্য কীভাবে পাগল হতে পারিস? তুই কত হেন্ডসাম। তোর পিছে তো সুন্দরি মেয়েরাই লাইন দিয়ে সিরিয়াল পাবে না। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কপাল কুচকে মুখটা পাঁচ ভাঙা দিয়ে তিরস্কারের স্বরে বলে রাশেদ।
জবাবে মুহিব শুধু একটা মুচকি হাসি ছাড়া আর কুছুই ফিরিয়ে দেয় না। তাকে চুপ থাকতে দেখে রাশেদ আরো রেগে যায়। রেগে বলে, তুই কাল থেকে আর ওর পিছু নিতে পারবি না। ওকে আমার একটুও পছন্দ না। এমনিতেই কালো। তার ওপরে চোখ দু টা কেমন বড়বড়। আবার দেমাগ দেখ! ছ মাস যাবৎ পিছনে পড়ে আছিস কোন পাত্তাই দিচ্ছে না। ওকে তুই কালকে যদি আবার প্রপোজ করতে যাস তোর খবর আছে বলে দিলাম। ওকে প্রপোজ করলে ভালবাসা দিবসের মানহানী হবে। আমি তোর নামে মানহানী মামলা করব দেখিস।
-তুই তো ভালো কমেডি পারিস দেখছি। মুহিবের কথা ফোটে এবার_ কমেডি পরে কর আগে চায়ের বিল দিয়ে মার্কেটে চল।
-আমার কাছে ভাংতি নেই তুই দে।
-তাহলে মার্কেটের মোটা বিলটা তুই দিস। যেহেতু তোর কাছে এত মোটা নোট।
রাশেদ বিল মিটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করে, মার্কেটে গিয়ে কী করবি?
-রোমানার জন্য কিছু কেনাকাটা করব।
-আবার ওই পেত্নিটার নাম নিচ্ছিস? আমি যাব না তুই যা। তোকে ভূতে ধরেছে। তোর সাথে গেলে আমাকেও ধরবে।
-যাবি না তো? ঠিক আছে যাস না! তোর বাবার কাছে যদি সব না বলে দিয়েছি তো আমার নাম…
কথা শেষ না হতেই রাশেদ দৌড়ে তার পাশে চলে আসে। ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কী বলে দিবি দোস্ত?
-যখন বলে দিব তখন বুঝবি। বাঁচতে চাইলে সাথে চল।
তারা আাবার পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। “জানিস রাশেদ? ওকে কেন এত ভালোবাসি নিজেও জানি না। ওর চোখ ওর হাসি ওর কথা কেমন যেন চুম্বকের মত আকর্ষণ করে আমায়। ওর দিকে সারাদিন শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ওকে আমার কাছে পরীর মত লাগে। এক মূহুর্ত ওকে না দেখলে কেমন ছটফট করে মনটা। তুই জিজ্ঞেস করেছিলি না ওর মাঝে কী আছে? ওর মাঝে ম্যাগনেট আছে ম্যাগনেট। আচ্ছা, ভালোবসা কি শুধু রূপ দিয়েই হয়? যার রূপ নেই তাকে কি ভালোবাসা যায় না? নাকি সে ভালোবাসার যোগ্য না?
আল্লাহ তো সবাইকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছে। ভালোবাসার জোড়া। একে অপরকে ভালোবাসার জন্য সৃষ্টি করেছে। ওরও তো জোড়া আছে এক জন। সে কি তাকে ভালোবাসবে না? আমার কেন যেন মনে হয় ওর সেই জোড়াটা আমিই। আমার জন্যই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ও আমার আমি ওর। ওর সাথে আমার প্রাচীন এক বন্ধন। যে বন্ধন ছিঁড়ে যাবার নয়।”
— তোর ওয়াজ শুনতে বিরক্ত লাগছে। একটু থাম। এত এত গিফ্ট কিনে কোন লাভ নেই। আগামিকালও সে তোকে একসেপ্ট করবে না। গ্যারান্টি। লিখে রাখ”।
-জানিস ও কেন একসেপ্ট করে না? ও ভাবে, ও কালো! তাকে কেউ সত্যিকারের ভালোবাসতে পারে না। হয়ত আমি তার সাথে অভিনয় করছি। দু দিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ইউজ করে ছেড়ে দেব। এই ভয়ে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। এজন্য ওকে আরো বেশি ভালো লাগে।
-কাল যদি একসেপ্ট না করে কী করবি?
-কী আর করব? আগে যা করেছি তাই করব!
-তুই আগে কী করেছিস রে?
-ওমা! কী আবার? ছ মাস না ঘুরলাম। আবার ঘুরব।
-তুই আসলেই মেন্টেল।
-হি হি হা
-না হেসে মার্কেট কর। এসে গেছি।
.
মার্কেটিং শেষে রাশেদ মুহিবের হাতের দিকে তাকায়। একগাদা শপিংব্যাগ। সে অবাক নেত্রে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
-কিরে? তুই প্রপোজ করতে যাচ্ছিস। বিয়ে না। ভুলে গেছিস? বলে রাশেদ।
-মনে আছে।
-তাহলে?
-তাহলে আর কী? প্রপোজ করব। তোকে নিয়েই প্রপোজ করব। থাকিস।
-বুঝি না তোর কাণ্ড-কারখানা।
-বুঝতে হবে না। কাল সকালে ফোন দিলে চলে আসিস।
.
রাশেদ তখনো নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। সূর্যের তেজ বাড়ছে। সাথে তার নাক ডাকার শব্দও বাড়ছে। রোদের তাপে যেন তার ঘুমও তপ্ত হচ্ছে। হঠাৎ বেয়াড়া মোবাইলের অসময়ের ক্রিংক্রিং শব্দ তার সাধের ঘুমটা ভেঙে খানখান করে দেয়।
ঘুমে জড়ানো কণ্ঠে রাশেদ ফোন কানে লাগিয়ে বলে, হেলো।
-শালা তোর পাছায় লাত্থি দেয়ার আগে ঘুম থেকে ওঠ। পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে চৌরাস্তায় আস।
-তুই প্রেম করবি _ আমার ঘুমের বারটা বাজাচ্ছিস কেন রে?
-তুই আসবি নাকি আমি আসব।
-না থাক তোর আসতে হবে না। আমিই আসছি। কে চায় শুধু শুধু নিজের শুক্ন নিছানাটা ভিজাতে। আগের বার শুকাতে তিন দিন লেগে ছিল। এবার তো ছ দিন লাগবে। যে শীত!
-বকবক রেখে তাড়াতাড়ি আস।
-আসছি।
.
রেডি হয়ে চৌরাস্তায় পৌঁছে তার চোখ ছানাবড়া। ইয়া বড় মাইক্রো বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুহিব।
-কিরে গাড়ি দিয়ে প্রপোজ করবি নাকি?
-চুপচাপ সমনের সিটে বোস।
সে সামনে গিয়ে বসে পড়ে। মুহিবও তার সাথে সামনে গিয়ে চাপাচাপি করে বসে।
-কিরে চাপাচাপি করছিস কেন? পছনে গিয়ে বোস। বলেই সে পেছনে তাকায়। পেছনে তাকিয়ে সে আরেকবার টাস্কি খায়। মুহিবের পুরো পরিবার গাড়িতে।
সে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করে, কিরে, পরিবার সহ প্রপোজ করবি?
-চুপচাপ বসে থাক।
সে চুপ হয়ে যায়। তার মাথা কাজ করছে না। গাড়ি চলতে শুরু করে। দশ মিনিট পর গাড়িটা থেমে যায়। রোমানাদের বাড়ির সামনে এসে থেমেছে। সে অবাক চোখে তাকায় তার দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাই ঘরে গিয়ে প্রবেশ করে। সেও তাদের অনুসরণ করে।
ভেতরে গিয়ে বসতেই একটা ছোট মেয়ে ট্রেতে করে সরবতের গ্লাস নিয়ে আসে। সবাই গ্লাস তুলে নেয়।
ধীরে ধীরে তার মনের খটকা সব দূর হতে থাকে। কিছুক্ষণ পর যখন রোমানা লাল একটা শাড়ি পরে ছোট ছোট কদম ফেলে ধীর পদে এগিয়ে এসে সামনের চেয়ারে বসে পড়ল তখন তার সব খটকা দূর হয়ে গেল।
মুহিবের কানের কাছে মুখ নিয়ে বিড়বিড় করে বলে, শালা_ প্রপোজের নাম দিয়ে বিয়ের প্রপোজ নিয়া আসছত।
-হ দোস্ত। কী আর করা।
-চুপ শালা। আগে বললেই তো পেটটা খালি করে আসতাম। এত এখন খাবার খাব কীভাবে?
এই রিমি_ বলে জোরে একটা ডাক দেয় মুহিব। রোমানার ছোট বোন বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। “ওকে একটু তোমাদের বাথরুমটা দেখিয়ে দাও তো”। বলতেই রাশেদ চোখ বড় করে তাকায়। শালা আমার মান ইজ্জত খাবি নাকি তুই।
” আসেন ভাইয়া” বলতেই রিমির পেছনে পেছনে চলতে থাকে রাশেদ। না গেলে আবার কেমন দেখায়।
মুহিব এবার রোমানার দিকে মনোযোগ দেয়। কেউ কিছু মন্তব্য করে কিংবা জিজ্ঞেস করে তার আগেই মুহিব ধাম করে বলে বসে, মেয়ে আমার ফুললি পছন্দ। এখন আপনারা শুধু ডেট ফিক্সড করুন। বলা শেষ হতেই তার মা রোমানাকে ভিতরে চলে যেতে বলেন। রোমানা ভিতরে যেতেই সে সবার উদ্দেশ্যে বলে, আপনাদের জানি পছন্দ হবে না মা। কিন্তু আমি ওকেই বিয়ে করব।
তার মা এবার মুহিবের মাথায় হাত রেখে বলে, ধুর পাগল! কে বলল পছন্দ হয় নি? তোর পছন্দই তো আমাদের পছন্দ।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে ডাক পরে মুহিবের। রিমি ডাকছে_ ভাইয়া আপু ডাকে। সে ওঠে চলে যায় ভেতরে। রোমানা একটা চেয়ারে পেছন ফিরে বসে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মুহিব দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। তাকে কাঁদতে দেখে সে বিব্রত বোধ করে। কী বলবে সে কিছুই বুঝতে পারে না। দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পর সে কথা বলে, “আচ্ছা রোমানা, তোমার যদি এ বিয়েতে মত না থাকে কিংবা অন্য কারো সাথে তোমার সম্পর্ক থাকে তাহলে বলতে পারো নির্দিধায়। আমি বিয়ে কেন্সেল করে দেব।
রোমানা পেছনে মুখ ফিরিয়েই বলে, হুম সম্পর্ক আছে। গভীর সম্পর্ক। তাকে আমি কখনোই ভুলতে পারব না। ওকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারব না। খোদা তাকেই এক মাত্র আমার জন্য বানিয়েছে। আমাকে তার জন্য। সেও আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। ওর মত কেউ আমাকে ভালবাসতে পসরবে না। জানো ও আমাকে কতটুকু ভালোবাসে? দেখো। তার দেয়া গিফ্টগুলো দেখো তাহলেই বুঝতে পারবে। বলেই সে একটা বড় খোলা বাকসো তার দিকে ঠেলে দেয়। সে তাকিয়ে থাকে বাকসোর দিকে। শুধু তাকিয়েই থাকে। তার চোখ নড়ে না। এ যে তারই দেয়া গিফ্টগুলো। তারও কান্না এসে যায়। চোখ টলটল করে জলে। এ কন্না খুশির কান্না। ভালোবাসার কান্না। মিলনের কান্না। কিন্তু কাঁদতে পারে না সে। তার আগেই রোমানা দৌড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পরে তার বুকে। কান্নায় তার মুখ থেকে কথা সরছে না। তবুও তোতলাতে তোতলাতে বলে, আই লাভ ইউ মুহিব….
.
__আব্দুল্লাহ আল মাসউদ

Share This:

Abdullahalmasud

লেখক হওয়ার স্বপ্ন বুনি

This Post Has One Comment

Close Menu

Content

Share This: