লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

স্বর্ণলতা এখন পড়াশুনা করছে। স্বর্ণলতার পরিবারে স্বর্ণলতা আর তার মা বাবা আর বড় ভাই থাকে। কিন্তু তাদের পরিবার ঠিক অন্য রকম। বিশেষ করে স্বর্ণলতার বাবা এবং তার দাদি চায় না স্বর্ণলতা এগিয়ে যাক পড়াশুনা করুক। তাদের মনে একটাই কুসংস্কার যে , মেয়েরা এ সব পারে না। মেয়েদের একটাই কাজ বিয়ে করবে বিয়ের পর সংসার করবে বাচ্চা লালন পালন করবে ঘরের কাজ করবে। কিন্তু স্বর্ণলতার মনে অনেক ইচ্ছে ভালো করে পড়াশুনা করবে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। স্বর্ণলতার ভাই তাজিম পরিবারের বড়। তার উপর একদম বাড়ির সবার রয়েছে আস্থা। তাকে নিয়ে দাদি বলেন , তাজিম এর এখন দরকার পড়া শুনা ভালো খাওয়া ছেলেকে ডাক্তার বানানো লাগবে না। তার মাঝে স্বর্ণলতা এসে বলছে , কেন দাদি ? আজকাল তো মেয়েরাও ডাক্তার হচ্ছে। দাদি স্বর্ণলতার কথায় একটু হলেও রেগে গিয়েছেন। এখানে মা এর কিছু বলার নেই কারণ মা তার দুই সন্তানকে অনেক ভালোবাসেন। একদিন স্বর্ণলতা পড়ছিলো আর মা কে বলছিলো , মা ! তুমি দেখো আমি একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবো। মেয়ের কথায় মায়ের মুখে একটুখানি হাসি আসে। এ দিকে স্বর্ণলতার ভাই তাজিম মায়ের কাছ থেকে টাকা চায়। বলে , মা টাকা লাগবে। হঠাৎ বাবা এসে হাসিমুখে বললেন , টাকা লাগবে বাবা, নাও। ছেলে তো টাকা পেয়ে অনেক খুশি ! অথচ একদিন স্বর্ণলতা তার দরকারে বাবার কাছে টাকা চেয়েছিলো কিন্তু বাবা বললেন , মেয়ে মানুষের এতো টাকা দেওয়া কিসের ? শুধু শুধু টাকা নষ্ট। স্বর্ণলতার মা স্বর্ণলতার বাবাকে বলেন ,মেয়েদেরও টাকা প্রয়োজন হয়। স্বর্ণলতার বাবা রেগে স্বর্ণলতার মা কে বলেন , শোনো মেয়ে মানুষ ঘর করবে সংসার করবে বুঝলে। স্বর্ণলতার মা বললেন , মেয়েরাও সব পারে তুমি বুঝলে ? এ বলে স্বর্ণলতার মা চলে গেলেন। তারপরের দিন স্বর্ণলতার ভাই তাজিম কোন এক মেয়েকে নিয়ে রিকশায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল হঠাৎ স্বর্ণলতা তা দেখতে পেলো। তারপর ঘরে এসে স্বর্ণলতা তার মা কে ব্যাপারটি বললো। মা তো একটু চিন্তিত হলেন। তারপর তাজিম যখন বাহির থেকে এসেছিলো তখন মা জিজ্ঞেস করলেন , বাবা। তুমি আজ কোথায় গিয়েছিলে ? তাজিম মা কে বললো , কোথায় না তো মা। ওই আমার একটা বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। মা বললেন , না তুমি কোনো বন্ধুর বাসায় যাও নি। রিকশায় কাকে নিয়ে ঘুরেছিলে ? তাজিম বললো , মা এসব কথা তোমাকে কে বলেছে ? ও বুঝেছি নিশ্চয়ই স্বর্ণলতা। আসলে না বাবা ঠিক বলে মেয়েরা কিছুই পারে না। এ বলে তাজিম চলে গেলো। এরপরের দিন স্বর্ণলতার মা দুধ গ্লাসে ঢালছিলেন হঠাৎ দাদি এসে বললেন ,বউ মা ! কার জন্য দুধ ঢালছো ? মা দাদিকে বললেন ,কেন মা ? দুজনের জন্যই ঢালছি। এ কথাটি শুনার পর দাদি বললেন , এ সব তুমি কি বলছো বউ মা ? আমি না তোমাকে বলেছি তাজিমকে বেশি করে দুধ খাওয়াও। স্বর্ণলতার মা একটু হেসে বললেন ,মা ওরা দুজনেই সমান বেড়ে উঠছে। তাই ওদের জন্য সমান খাবারটাই দরকার। এ বলে স্বর্ণলতার মা চলে গেলেন। আর দাদি মনে মনে বললেন , এ কাকে ছেলের বউ বানালাম। ! তারপর স্বর্ণলতার বাবা স্বর্ণলতার মা কে বললেন , তুমি বলে আজকে মায়ের মুখের উপর কথা বলেছো ? মা বললেন , এ খানে তুমি মুখের উপর কথা বলার কি দেখলে ? বাবা বললেন , শুনো মেয়েদের এতো কথা সাজে না বুঝেছো ? তারপর স্বর্ণলতার বাবা ঘুমিয়ে গেলেন। তার পরের দিন তাজিম ফোনে কথা বলছিলো হঠাৎ মা এলেন মায়ের আসা দেখে তাজিম তাড়াতাড়ি তার ফোনটি রেখে দিলো। কিন্তু মা বুঝতে পারলেন মা তাজিমকে বললেন , তাজিম বাবা কার সাথে কথা বলছিলে ? তাজিম বললো , ওই তো আমার এক বন্ধু ফোন করেছে। মা বললেন , তাই বলে পড়ার সময় ফোন ? তাজিম একটু চুপ হয়ে গেলো। মা বললেন , সামনে তোমার পরীক্ষা। এ সময় যদি এতো ফোন নিয়ে থাকো তাহলে পড়াশুনা কি করে হবে ? তারপর তাজিম মা কে সরি বললো। এরপরের দিন স্বর্ণলতার জন্য বাবা ছেলে ঠিক করলেন স্বর্ণলতার দাদি তো খবরটি শুনে মহা খুশি। স্বর্ণলতার মা কে খবরটি শুনানো হলো। মা স্বর্ণলতার বাবাকে বললেন , এ সব কি হচ্ছে ? বাবা বললেন , কেন বুঝতে পারছো না ? মেয়ের জন্য ছেলে ঠিক করেছি। আগামী সপ্তাহে দেখতে আসবে। স্বর্ণলতা সব কথা শুনতে লাগলো। মা বাবাকে বলছেন , এ কাজ তুমি করতে পারো না। তুমি জানো এ বয়সে বিয়ে দেওয়া কতটা বেঠিক। আর ওতো এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। বাবা বললেন , এতো কথা ভালো লাগে না। ওরে দেখতে আসবে ওকে প্রস্তুত করে রাখিও। এ বলে বাবা চলে গেলেন। তারপর স্বর্ণলতা খুব ভোরে ব্যাগ গুছোচ্ছে মা সেটি লক্ষ্য করে বললেন , মা তুই কোথায় যাচ্ছিস ? স্বর্ণলতা বললো , মা আমি চলে যাচ্ছি। মা বললেন , কোথায় ? স্বর্ণলতা বললো , হোস্টেলে। মা বললেন , হোস্টেলে কেন মা ?মা অনেক চিন্তিত হয়ে কথাটি বললেন। স্বর্ণলতা বললো , মা আমি এই বিয়েতে রাজি নই . তারপর স্বর্ণলতা তার মা কে বললো , মা তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি রোজ তোমাকে ফোন করবো প্লিজ মা। এরপর স্বর্ণলতা চলে গেলো। তারপরের দিন স্বর্ণলতাকে দেখতে ছেলে পক্ষরা আসে। কিন্তু স্বর্ণলতাকে না পেয়ে তারা চলে যায়। স্বর্ণলতার দাদি ও অনেক চিন্তিত হয়ে পড়েন। বাবা মা কে বললেন , স্বর্ণলতা কোথায় গেছে ? মা বললেন , দেখো , মেয়েটিকে নিয়ে এমন করা তোমার কি ঠিক হয়েছে ? বাবা বললেন , এতো কথা কেন বলছো ? শুধু বলো স্বর্ণলতা কোথায় ? মা বললেন , তা আমি তোমাকে বলবো না। এ বলে স্বর্ণলতার মা চলে গেলেন। তারপরের দিন তাজিম তার প্রেমিকার সাথে ফোনে কথা বলছে , কি করছো তুমি ? প্রেমিকাটি বললো , এ তো চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাজিম তার প্রেমিকার কথায় বিরক্ত হয়ে বললেন , আচ্ছা , তোমরা মেয়ে হয়েছো বলে এই না তো যে চাকরিও করতে হবে। প্রেমিকা বললো ,শুনো মেয়েরা এখন ঘরে বাহিরে সব খানে কাজ করে। তুমি তো দেখছি আগের যুগের মতোই আছো ? তাজিম প্রেমিকাকে বললো , শুনো আমাদের বিয়ের পর আমি যাতে তোমাকে চাকরি করতে না দেখি। প্রেমিকাটি বললো , তুমি আমাকে দেখতেও পাবে না কারণ আমি তোমাকে বিয়ে করছি না। তাজিম বললো ,মানে ? প্রেমিকাটি বললো , মানে খুবই সোজা। যারা কি না নারী জাতিকে ঘৃণা করে আমি তাদের পছন্দ করি না। যুগ এখন আধুনিক হয়ে গিয়েছে তাই যুগ বদলাও। আর আমার চাকরির সময় হয়ে যাচ্ছে আমি রাখি। এ বলে ফোন কেটে গেলো . তারপরের দিন মা দরজা খুলতেই স্বর্ণলতাকে দেখে অনেক অবাক হয়ে খুশি হলেন স্বর্ণলতা মা কে দেখে বললো , মিষ্টিমুখ করো। আমার টাকায় প্রথম মিষ্টি। মা ব্যাপারটি বুঝতে না পেরে বললেন , কি হয়েছে মা ? স্বর্ণলতা বললো , মা আমার সরকারি চাকরি হয়েছে !!! কথাটি শুনে বাবা দাদি এমনকি স্বর্ণলতার ভাই ও অবাক ! মা খুশি হয়ে বললেন , মা রে আমি জানতাম আমার মেয়ে তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। তার পরের দিন দাদির তার ভুল ভেঙে স্বর্ণলতার মা কে বললেন , আমি তো অনেক আগের মানুষ। ছোটবেলায় বিয়ে হইসে তাই বুঝতে পারি নাই। বউ মা আমারে ক্ষমা করে দিও। স্বর্ণলতার মা বললেন , মা আপনি যা বলেছেন আপনি যা দেখে এসেছেন তাই তো বলেছেন এতে ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। তারপর স্বর্ণলতার বাবাও স্বর্ণলতার মা কে বলছেন , আমি এতো দিন বুঝতে পারি নাই যে মেয়েরাও এতো কিছু পারে। আমি আমার মা এর উপর মহা ভুল করে ফেলেছি। স্বর্ণলতার মা বললেন , তুমি যে তোমার ভুল বুঝতে পেরেছো এতেই আমি অনেক খুশি। তারপর স্বর্ণলতার ভাই তার বোনকে বললো , তুমি এসেছো তাই অনেক ভালো লাগছে ! স্বর্ণলতা হেসে বললো , কেন রে ? আর কারো আসার কথা ভাবছিলি ? তাজিম বললো , আরে কি যে বলো না ! তারপর তাজিম বললো , জানো আগে আমার মেয়েদের প্রতি একটা কুসংস্কার ছিল। সেটি হলো মেয়েরা কিছুই পারে না। আজ তোমাকে দেখে আমার সব ভুল কেটে গিয়েছে আমি আজ বুঝতে পারলাম মেয়েরাও সব পারে। স্বর্ণলতা খুশি হয়ে বললো , শুধু মেয়ে কেন ? আমি মনে করি ছেলে মেয়ে দুজনই যদি সমান ভাবে তাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায় তাহলে সবই সম্ভব।

Share This:

ROSY BEGUM

আমি রসিক মানুষ। ভালোবাসি ফেইসবুক চালাতে , ম্যাগাজিন পড়তে আর ঘুমাতে।
Close Menu

Content

Share This: