ফরজ ও ওয়াজিব এর মধ্যকার পার্থক্য জানেন তো?

ফরজ ও ওয়াজিব এর মধ্যকার পার্থক্য জানেন তো?

ইসলাম শব্দটি আরবি মূলধাতু “সিলমুন” থেকে এসেছে । এর অর্থ হলো শান্তি । ইসলাম ধর্ম যে শান্তির ধর্ম তা এখান থেকেই বুঝা যায় ।

ইসলামের অনুসারীদের মুসলিম বা মুসলমান বলা হয় । ইসলাম ধর্মের নীতি , অনশাসন গুলো অর্থাৎ একজন মুসলিম কিভাবে জীবন যাপন অনুসরণ করবে , কিভাবে পরকালে জান্নাত(পরম সুখের স্থান) লাভ করবে তা জানার উপায় হলো শরীয়ত( এটা আরবি শব্দ । এর অর্থ হলো পথ বা রাস্তা) ।

শরীয়ত হলো ইসলামি বিধি-বিধানের সমন্বিত রুপ । পরিভাষায় শরিয়ত বলতে এমন সুদৃঢ় সোজাপথকে বুঝায় যার দ্বারা তার অবলম্বনকারী ব্যক্তি হিদায়েত ও সামন্ঞ্জস্য পূর্ণ কর্মপন্থা লাভ করতে পারেন। আর আহকাম হলো বিধানবলি । প্রতিটা বিষয়ের কিছু পরিভাষা থাকে । ইসলামি শরিয়তেরও এরূপ বেশ কিছু পরিভাষা বিদ্যমান । এসব পরিভষার মাধ্যমে শরিয়তের বিধানবলির পর্যায়ক্রমিক গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় । ইসলামি শরিয়তের আহকাম বা বিধানবলি সংক্রান্ত পরিভাষাগুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো – ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, মুবাহ ইত্যাদি ।

আস্সালামু আলাইকুম,
আমি আসিফ আমান জিহাদ(রংধনু) আপনাদের জন্য ইসলামের শরীয়তের পরিভাষা গুলোর মধ্যে কয়েকটি প্রধান পরিভাষা নিয়ে কথা বলব। এই দুটি হলো

  1. ফরজ
  2. ওয়াজিব
  3. সুন্নাহ বা সুন্নত

প্রথমে আমরা জেনে নেই এই ফরজ সম্পর্কে

ফরজ

ফরজ আরবি শব্দ । এর অর্থ হলো অবশ্য পালনীয়, অত্যাবশ্যক। শরিয়তের যে সব বিধান কুরআন- সুন্নাহর অকাট্য দলিল দ্বারা অবশ্য কর্তব্য ও অলঙ্ঘনীয় বলে প্রমাণিত তাকে ফরজ বলা হয় ।

ফরজ কাজ কোনো অবস্থাতেই পরিত্যাগ করা যায় না । ফরজ কাজ অস্বীকার করলে ইমান থাকে না বরং এর অস্বীকারকারী কাফির হয়ে যায়(কাফির= যে ব্যক্তি কুফরি করে তাকে কাফির বলা হয় ) । ফরজ কাজ না করলে বা পালন না করলে কবিরা গুণাহ বা মারাত্মক পাপ হয় । ফরজ কাজ না করলে আখিরাতে ভয়ঙ্কর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে ।

ফরজ কাজ গুলো যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা এখান থেকেই বুঝা যায় । ফরজ কাজ দুই প্রকার। যথা

  1. ফরজে আইন
  2. ফরজে কিফায়া

এখন চলুন এই প্রকারভেদ গুলো সম্পর্কে জানে নাই ,

ফরজে আইন

যে সকল ফরজ কাজ বা বিধান সকলের উপর পালন করা অত্যাবশ্যক তাকে ফরজে আইন বলে । অর্থাৎ যেসব ফরজ কাজ বা বিধান ব্যক্তিগত ভাবে সকল মুসলমানকেই আদায় করতে হয় সেগুলোকে ফরজে আইন বলা হয়। যেমন – দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা , রমযান মাসে রোযা রাখা এসব কাজ বা বিধান প্রত্যেক ব্যক্তিকেই নিজে আদায় করতে হয় । এগুলো ফরজে আইন । যাকাত প্রদান ও হজ্জ পালন করা সবার উপর ফরজ নয় । এগুলো ব্যক্তিবিশেষে ফরজ( এই বিষয়ে পরবর্তী পোস্টে জানানো হবে)

ফরজে কিফায়া

ফরজে কিফায়া হলো সামষ্টিক ভাবে ফরজ কাজ । অর্থাৎ যেসব কাজ মুসলমানের উপর ফরজ , কিন্তু সমাজের কতিপয় মুসলমান যদি আদায় করে ফেলে তবে সকলের পক্ষ থেকে পালন বা আদায় হয়ে যায়। কিছু লোকের আদায় করার দ্বারা সমাজের বাকি লোকদের আদায় হয়ে যায় অর্থাৎ বাকি সবাই সেই দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয় । তবে যদি সমাজের কেউ ই আদায় না করে তাহলে উক্ত সমাজের সবাই গুণাগার হবে এবং সবাইকে শাস্তি পেতে হবে । যেমন – জানাযার সালাত । কোনো ব্যক্তি মূত্যুবরণ করলে ঐ এলাকার সবার উপর তার জানাযার সালাত আদায় করা ফরয হয়ে যায় । এ পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের কতিপয় মুসলমান যদি তার জানাযার সালাত আদায় করে ফেলে তাহলে উক্ত এলাকার বাকি সবার আদায় হয়ে যায় অর্থাৎ তারা এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পায় । কিন্তু যদি কেউই ঐ মৃত ব্যক্তির জানাযার সালাত আদায় না করে তবে সকলেই ফরজ ত্যাগের  কারণে গুনাহগার হবে।

আশা করি ফরজে কিফায়া কি বুঝতে পেরেছেন। চলুন এবার জেনে নেই  ওয়াজিব সম্পর্কে ।

ওয়াজিব

ওয়াজিব আরবি শব্দ । এর শাব্দিক অর্থ হলো অবশ্য পালনীয়, কর্তব্য, অপরিহার্য ইত্যাদি । শরিয়তের এমন কিছু বিধান রয়েছে যা পালন করা কর্তব্য । তবে ফরজ নয় । এরুপ বিধানকে ওয়াজিব বলে। অনেকের প্রশ্ন যে ফরজ আর ওয়াজিবের অর্থ অনেকাংশে এক তাহলে বুঝবো কি করে কোনটা ফরজ আর কোনটা ওয়াজিব । এর উত্তর এদের সংজ্ঞায় দেয়া আছে । আমি ফরজের সংজ্ঞায় বলেছি যে এগুলো কাজ কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিল দ্বারা সিদ্ধ । কিন্তু ওয়াজিবের মধ্যে এই কথাটা বলা নেই । আশা করি মূল পার্থক্যটা এখানেই বুঝতে পেরেছেন ।

শরিয়তে ফরজের পরের অবস্থান হলো ওয়াজিবের স্থান । এটি ফরজের কাছাকাছি । অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত না হলেও এটা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। ওয়াজিব অস্বীকার করলে মানুষ কাফির হয়ে যায় না ( ফরজ অস্বীকার করলে কাফির হয়ে যায়) । তবে সে বড় রকমের পাপ বা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে । ওয়াজিব কাজ না করলে বা আদায় না করলেও কঠিন ধরণের পাপ হয় । এর জন্য আমাদের আখিরাতে শাস্তি পেতে হবে ।ইসলামে শরিয়তে বহু ওয়াজিব রয়েছে । যেমন – দুই ইদের সালাত আদায় করা , বিতরের সালাত আদায় করা ইত্যাদি । সালাত আদায়ের ক্ষেত্রেও বেশ ওয়াজিব কাজ রয়েছে । যেমন- সূরা ফাতিহা পড়া , রুকুর পর সোজা হয়ে দাড়ানো , সিজদাহর মধ্যে সোজা হয়ে বসা ইত্যাদি । সালাতের এসব ওয়াজিব কাজ বাদ দিলে বা ভুলে বাদ পড়লে সিজদা সাহু দিতে হয় । নতুবা সালাত শুদ্ধ হয় না । পুনরায় আদায় করতে হয় ।

আশা করি আপনারা ওয়াজিব কি, কোনগুলো , এর কাকে বলে বুঝতে পেরেছেন । এর সম্পর্কে বিস্তাড়িত জানতে হলে কমেন্টে জানাবেন আমি জানানোর চেষ্টা করবো । চলুন এবার জেনে নেই সুন্নাহ বা সুন্নত সম্পর্কে

সুন্নত বা সুন্নাহ

সুন্নাহ বা সুন্নত আরবি শব্দ । এর অর্থ হলো পথ, পন্থা, রীতি, নিয়ম, পদ্ধতি ইত্যাদি।  পরিভাষায় মহানবি (সাঃ) থেকে যে সমস্ত কাজ ইসলামি শরিয়তের বিধান হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে সেগুলোকে বলা হয় সুন্নত । অর্থাৎ যে সকল কাজ মহানবি (সাঃ) নিজে করেছেন বা যা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা অনুমোদন করেছেন তাকে সুন্নত বলা হয় । সুন্নত দুই প্রকার । এগুলো হলো

  1. সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ
  2.  সুন্নতে যায়িদাহ

এবার চলুন এগুলো সম্পর্কে একটু জেনে নেই ।

সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ

যে সকল কাজ মহানবি হযরত মুহাম্মদ  (সাঃ) নিজে সর্বদা পালন করতেন, অন্যদের কে তা পালনের তাগিদ দিয়েছেন তাকে বা সেই কাজ গুলোকে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বলে । যেমন- আযান ও একামত দেয়া , ফজরের ফরজ নামাযের পূর্বে দুই রাকাত, যোহরের ফরজের পূর্বে চার রাকাত ও পরে দুই রাকাত , মাগরিব ও এশার ফরজের পর দুই রাকাত নামায আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ ।

সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ ওয়াজিবের কাছাকাছি । এগুলো পালন করা কর্তব্য । ইচ্ছাকৃত ভাবে বা অবহেলাবশত বিনা কারণে এগুলো পালন না করলে গুণাহ হয় ।

 

সুন্নতে যায়িদাহ

সুন্নতে যায়িদাহ হলো অতিরিক্ত সুন্নত হ পরিভাষায়, যে সকল কাজ নবি করিম (সাঃ) করেছেন বলে প্রমাণিত তবে তিনি সর্বদা তা পালন করতেন না , বরং কখনো করতেন কখনো করতেন না আবার কখনো ছেড়ে দিতেন এসব কাজকে সুন্নতে যায়িদাহ বলা হয় । মহানবি (সাঃ) এরূপ কাজ করার জন্য উম্মতকে  উৎসাহিত করেছেন । তবে এ ব্যাপারে তিনি তাগিদ করেননি এবং তা না করলে গুণাহ হয় না । সুন্নতে যায়িদাহ সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদাহও  বলা হয় । যেমন – আসর ও এশার ফরজ নামাযের পূর্বে চার রাকাত সুন্নত নামায আদায় করা । সুন্নতে যায়িদাহ পালনে অনেক সাওয়াব অর্জন করা যায় ।

 

উপরে যেহেতু আপনাদের বলেছি যে ফরজ, ওয়াজিব , সুন্নত নিয়ে কথা বলবো তবে আপনাদের জন্য কিছু অতিরিক্ত পরিভাষা বলে দিলাম । বলতে পারেন একটু অতিরিক্ত আপনাদের ভালোবাসি তাই সেখান থেকেই আরো দুটো পরিভাষা নিয়ে কথা বলব

মুস্তাহাব

মুস্তাহাব অর্থ পছন্দনীয় । যে সকল কাজের প্রতি রাসুলুল্লাহ(সাঃ) উম্মতকে উৎসাহ প্রদান করতেন এবং তা করলে নেকি পাওয়া যাবে , কিন্তু না করলে গুণাহ হবে না সেসব কাজকে শরিয়তে মুস্তাহাব বলে।

ফরজ , ওয়াজিব ও সুন্নত ব্যতীত অতিরিক্ত সব ধরণের ইবাদত ও ভালো কাজই মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য । এই মুস্তাহাবকে নফল বা মানদুবও বলা হয় । অনেকেই নফল নামায পড়েন । ভালো কাজ করার আগে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া ভালো এতে কাজের উপর আল্লাহ ফযিলত বর্ষিত হয় ।

এবার চলুন জেনে নেই আজকের আলোচনার শেষ পরিভাষার শব্দটি সম্পর্কে ।

মুবাহ

যে সকল কাজ করলে কোনো রূপ সাওয়াব নেই, আবার না করলে কোনোরুপ গুণাহও হয় না এরুপ কাজকে মুবাহ বলা হয় । মানুষ ইচ্ছা করলে এরুপ কাজ করতে পারে আবার ইচ্ছা না করলে তা না-ও করতে পারে ।

আশা করি আমি আপনাদের আজকে একটু হলেও কিছু ইসলামিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছি । তথ্য গুলো ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা(নবম -দশম শ্রেণি- ২০১৬) থেকে সংগৃহিত ।

আর্টিকেল টি সম্পর্কে মতামত, ভুল , পরামর্শ থাকলে তা কমেন্টে জানাবেন । ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন ।

-রংধনু

ধন্যবাদ সময় নিয়ে পড়ার জন্য
Share This:

রংধনু

আমি আসিফ আমান জিহাদ । একজন শিক্ষার্থী যে নতুন কিছু শিখতে শেখাতে ও জানাতে পছন্দ করে। এবং সর্বদা কথা কাজ তথ্য দিয়ে মানবতার পাশে থাকতে চাই
Close Menu

Content

Share This: